বিংশ শতাব্দীর বাংলা কবিতার এক বিষণ্ণ, স্বপ্নালু ও রহস্যময় কণ্ঠস্বর জীবনানন্দ দাশ। আজকে আমরা জীবনানন্দ দাশের দর্শন আলোচনা করব।
তাঁর কবিতা শুধু প্রকৃতির রূপায়ণ বা ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ নয়, রয়েছে এক গভীর দার্শনিক জিজ্ঞাসা ও জীবনবোধ।
সময়ের স্রোত, মানুষের অস্তিত্ব, নশ্বরতা, স্মৃতি, স্বপ্ন এবং প্রকৃতির অনন্ত রহস্য তাঁর কাব্যে জটিল অথচ কাব্যিক দার্শনিক ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
ঝড়াপালক, ধূসর পান্ডলিপি তাঁর অন্যতম আলোচিত কাব্যগ্রন্থ।
জীবনানন্দ দাশের কাব্যতাত্ত্বিক ভাবনা:
জীবনানন্দ দাশকে আমার কবি হিসেবে সকলেই চিনি ও জানি! সাম্প্রতিক সময়ে তার কিছু উপন্যাস, ছোটগল্প ইত্যাদি প্রকাশিত হওয়ায় তাকে গদ্য-সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
তার লিখিত ও অপ্রকাশিত অনেক প্রবন্ধ রয়েছে, যা বর্তমানে বিভিন্ন সংকলনে প্রকাশিত হচ্ছে।
আজকের আলোচনায় আমরা জীবনানন্দ দাশের কাব্য, বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ কোন ধরনের দার্শনিক চিন্তা বিধিত হয়েছে তা তুলে ধরে সেই মতামত সমূহের তাত্ত্বিক পর্যালোচনা করার চেষ্টা করব! এক্ষেত্রে অন্যান্য কাব্য তাত্বিকদের মতের সাথে তার ও দৃষ্টিভঙ্গির তুলনা করে, তার মতের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উৎকর্ষ যাচাই করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।
জীবনানন্দ দাশের মতে, কবিতা হচ্ছে হৃদয়ের কল্পনা ও কল্পনাজাত চিন্তার ফসল! এ কল্পনামূলক চিন্তার সাথে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সমসাময়িক কালের কাব্য বিকিরণের প্রভাব মিশ্রিত রয়েছে।
অর্থাৎ কবিতা সৃজনের জন্য কবির হৃদয়ে পর্যাপ্ত কল্পনাশক্তি থাকতে হয়! কল্পনা, তার মতে এলামেলো ভাবনা নয়। বরং এক চিন্তামূলকভাবের সৃষ্টিকারী হতে হয়।
কবি কল্পনা করেন, কোন বিশেষ ভাবকে প্রদানের নিমিত্তে সৃষ্টি করেন এক মানবিক রূপকল্প, এই রূপকল্প মূলত গঠনমূলক, সৃজনশীল কল্পনারই ফসল! কবির এই রূপকল্পের সাথে সমাজ, সভ্যতা ও মাধ্যমে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাকেও কবি কাজে লাগান।
অন্যদিকে তিনি অতীত কাব্য ঐতিহ্য ও সমকালীন কাব্য রস আস্বাধন করেও কল্পনাকে আরো শানিত করেন! এসব গুণ থাকলেই একজন কবি যথার্থ কবি হতে পারেন! কেবল যেকোনোভাবে কবিতা লিখলেই যথাথ কবি হয়ে যায় না বলে জীবনানন্দ দাশ মনে করেন। তার ভাষায় সকলেই কবি নয়।
কেউ কেউ কবি। কেননা তাদের হৃদয় কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতা তার স্বতন্ত্র সারসত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য, তাদের সাহায্য করেছে।
জীবনাননদের বক্তব্য থেকে কবিতার জন্য যে সকল বিষয় আবশ্যিক তার তালিকা হলো প্রথম- কল্পনাপ্রসূত চিন্তা, দ্বিতীয়ত বাস্তব অভিজ্ঞতা, তৃতীয়ত, অন্যান্য কাব্যধারার প্রভাব।
জীবনানন্দ দাশের কাব্যতাত্ত্বিক দর্শন এর দৃষ্টান্ত:
এ পর্যায়ে কাব্যতত্ত্বের এসব বিষয় গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা দরকার। প্রথমেই কল্পনা সংক্রান্ত বিষয়- আলোচনা দ্বারা শুরু করা যাক।
রোমান্টিক কবি পি.বি. শেলি কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে, বলেন:
“Poetry is a general sense, may be define to be the expression of the imagination”
কল্পনাশক্তিকে তিনি মানুষের এক অতিরিক্ত শ্রেণির আবেগের ফসল বলে মনে করেছেন! আবেগ কোনো মানুষের মধ্যে অবস্থান করলে তা আর প্রকাশ না হয়ে পারে না! আর এর প্রকাশ হলো কবিতা এবং তার ভাষায় বিভিন্ন রকমের শিল্প।
অন্য এক রোমান্টিক কবি, ওয়ার্ডসওয়ার্থ কবিতা সম্পর্কে বলতে, গিয়ে বলেছেন. “Poyetry is the spontaneous overflow of power feelings: it take its origin from emotion collected in tranquility”.
তিনি ইমোশন বা আবেগ বলতে এখানে যা বুঝেছেন তা মূলত কল্পনা সৃষ্টিকারী আবেগ! আবেগ নির্ভর চিন্তা থেকে আসে প্রশান্তি ও কাব্যিক প্রেরণা! এই আবেগনির্ভর চিন্তায় মূলত কল্পনা। এটি কবির সর্বাপেক্ষা বড় শক্তি।
জন কিটস প্রমুখ কবিরা কল্পনার মাধ্যমে দৃশ্যমান বস্তু বা বিষয়ের অন্তরালের অন্য এক বাস্তবতা, কোনো সুন্দর জগৎ বা বিষয়কে অনুভব করেছেন
প্রত্যক্ষিত ঘটনার সাথে কল্পনায়, যেমন অতীতের সাথে সাদৃশ্য করেছেন, অন্যদিকে সেই বিষয়টিকে অনন্তকালিক কোনো ধারণা বা আদর্শের সাথেও যোগ করতে চেয়েছেন।
যেমন- জন কিটস তার টু এ নাইটিঙ্গেল কবিতায় বুলবুলি পাখির সঙ্গীতকে প্রত্যক্ষ করে বলেন:
Thou wast not born for death, immortal Bird!
No hungry generations tread thee down;
The voice I hear this passing night was heard
In ancient days by emperor and clown:
Perhaps the self-same song that found a path
Through the sad heart of Ruth, when, sick for home,
She stood in tears amid the alien corn;
The same that oft-times hath
Charm’d magic casements, opening on the foam
Of perilous seas, in faery lands forlorn.
জীবনানন্দ দাশের দৃষ্টিতে কবিতা:
কবিতাকে জীবনানন্দ দাশ যে অর্থে কল্পনানির্ভর বলেছেন, সেই ক্ষেত্রে একে বিচার বুদ্ধিমুক্ত কল্পনা বলা চলে না। কেননা তিনি কল্পনার মধ্যে চিন্তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এ প্রসঙ্গে কলরিজের বক্তব্য প্রাণিধানযোগ্য- “বিচার বুদ্ধি হলো কাব্যিক প্রতিভার দেহ, অলীক কল্পনা হচ্ছে এর পোশাক, গতি হচ্ছে এর জীবন ও কল্পনা হলো এর আত্মা। কল্পনাই পারে সবকিছু একটা কমনীয় বুদ্ধিদীপ্ত সমগ্রে রূপ দিতে।”
জীবনানন্দ দাশের কাব্য ভাবনায় কবিতার জন্য কল্পনার সাথে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিজ্ঞতা। কবি একজন সামাজিক মানুষ। এই বস্তুজগত ও মানবসমাজ কবি মানসে অনেক অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করে। কবি এই অবিজ্ঞতার জগত দ্বারা তার চিন্তাকে নানা জ্ঞানে ও তথ্যে পূর্ণ করেন। আর তাই কবি বলতে সক্ষম হয়েছেন- “প্রান্তরের সবুনজ বাতাস”, “নম্রনীল জোসনা”, “চালের ধূসর গন্ধ” ইত্যাদি।
কবি জীবনানন্দ দাশের মতে- বিশ্বের বিভিন্ন ধরনের কাব্য সম্ভারের মধ্যে থেকে সাহায্য নিতে হলেও বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। যে সকল ব্যক্তি উন্নত কল্পনা শক্তির ধারক ও বাহক, তারা চিন্তা ও অভিজ্ঞতা ধারণ করতে পারে। আর তারাই এর সাহায্য নিয়ে নিজের কাব্য সাধনাকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
কবিতার ক্ষেত্রে কল্পনা, কল্পনা, কল্পনার ভিতর চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও কাব্যিক ঐতিহ্যর শিক্ষা ইত্যাদি বিষয় থাকা সত্তেও একটি প্রশ্ন খুবই প্রাসঙ্গিক যে কাব্য চেতনা কি কেবল অন্যান্য সাহিত্য ধারার মিথস্ক্রিয়ার ফসল না কি ঐ মিথস্ক্রিয়া কাব্য দক্ষতাকে কেবল শানিত করে তোলে? এই প্রশ্নের উত্তররে জীবনানন্দ দাশ কাব্য চেতনাকে সহজাত গুণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
জীবনানন্দ দাশের কাব্যর দর্শন মূল্যায়ন:
জীবনানন্দ দাশের কবিতা শুধু প্রকৃতির রূপায়ণ বা ব্যক্তিগত বেদনার প্রকাশ নয়, এর গভীরে প্রোথিত রয়েছে এক গভীর দর্শন জিজ্ঞাসা ও জীবনবোধ।
“একদিন জল ভেঙে ধানসিঁড়ি নদীর কিনারে / দেখিব—কাঁঠাল গাছে জাম্বুরা লিচুর ভিড়ে / আমার সোনার ধান ঘুমে অচেতন—” (রূপসী বাংলা)
এখানে নদীর তীরে সোনার ধানের অচেতন ঘুম যেন সময়ের স্রোতে জীবনের বিলীন হয়ে যাওয়ার প্রতীক।
“সকল লোকের মাঝে ব’সে / আমার নিজের মুদ্রাদোষে / আমি একা হতেছি আলাদা / আমার চোখেই শুধু ধাঁধা” (ধূসর পাণ্ডুলিপি)
এই পঙ্ক্তিটিতে কবির নিঃসঙ্গতা এবং অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্নতার বোধ প্রকট, যা অস্তিত্ববাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
জীবনানন্দের কবিতায় সময় একটি বহমান এবং পরিবর্তনশীল সত্তা। ইতিহাস স্মৃতি ও বিস্মৃতির এক অদ্ভুত খেলা, যেখানে বর্তমান অতীতের ছায়া বহন করে।
“হাজার বছর শুধু খেলা করে / অন্ধকার আর আলোর গভীরে।” (বনলতা সেন)
এই বিখ্যাত পঙ্ক্তিটিতে সময়ের অনন্ত প্রবাহ এবং আলো-অন্ধকারের দ্বৈততা দার্শনিক তাৎপর্যপূর্ণ।
“আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন পথের ধারে ধারে, / আমরা দেখেছি যারা পুরোনো পাতার স্তূপ।” (আট বছর আগের একদিন)
জীবনানন্দের প্রকৃতি শুধু মনোরম দৃশ্য নয়, বরং এক গভীর রহস্যের আধার।
প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান যেন জীবনের কোনো না কোনো দার্শনিক সত্যের ইঙ্গিত বহন করে।
“আকাশের রং নীলাভ—কাশফুলের মতো নরম— / শিশিরের জল—সবুজের ঘ্রাণ—আমারো বুকের তলে।” (রূপসী বাংলা)
প্রকৃতির এই শান্ত ও স্নিগ্ধ রূপ কবির অন্তরের গভীরেও এক রহস্যময় অনুভূতি জাগায়।
“একদিন এই পথে থেমে রবে জীবনের সব লেনদেন।” (আকাশের সাতটি তারা)
জীবনানন্দের কাব্যে স্মৃতি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অতীত দিনের অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতি বর্তমানকে প্রভাবিত করে। আবার সময়ের সাথে সাথে অনেক স্মৃতি বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়।
“তবুও তো মনে পড়ে কোনো এক বাঁকা জলরেখা / হেমন্তের সন্ধ্যায়।” (বনলতা সেন)
অতীতের একটি সামান্য দৃশ্যও কবির মনে গভীর আবেগ ও স্মৃতি জাগাতে পারে।
“সব পাখি ঘরে ফেরে—সব নদী—ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন; /থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।” (বনলতা সেন)
আরো কিছু আলোচনা:
জীবনানন্দ দাশের কবিতা ও কাব্যে এই দার্শনিক মূল্যায়নগুলি বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে বরং একটি সামগ্রিক জীবনবোধের অংশ হিসেবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। তাঁর কবিতা একদিকে যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্য ও জীবনের নশ্বরতার কথা বলে, তেমনই অন্যদিকে মানুষের গভীরতম অনুভূতি ও অস্তিত্বের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করে। জীবনানন্দ প্রকৃতিকে গভীর ও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং সেখান থেকে অজস্র নতুন উপমা তুলে এনেছেন।
“পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন” (বনলতা সেন) এখানে নারীর চোখকে পাখির নীড়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যা গভীর আশ্রয় ও শান্তির ইঙ্গিত দেয়।
“ঘাস হয়ে সবুজ ধরেছি আমি” (আকাশের সাতটি তারা) কবির নিজেকে ঘাসের সাথে তুলনা করা প্রকৃতির সাথে একাত্মতার প্রকাশ।
“নীল নবমীর চাঁদ যেন নেমে আসে” (শঙ্খমালা) চাঁদের স্নিগ্ধতাকে নবমীর চাঁদের বিশেষ সৌন্দর্যের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
জীবনানন্দ কখনও কখনও ইতিহাস ও পুরাণের অনুষঙ্গ ব্যবহার করে কবিতায় গভীরতা সৃষ্টি করেন।
“চুলের মতো কালো অন্ধকার” (বনলতা সেন) এখানে চুলের কৃষ্ণতাকে এক রহস্যময় অন্ধকারের সাথে তুলনা করা হয়েছে, যা যেন কোনো সুদূর অতীতের স্মৃতি বহন করে।
“বিম্বিসার অশোকের ধূসর পৃথিবী” (আট বছর আগের একদিন) ঐতিহাসিক চরিত্রগুলির উল্লেখ সময়ের বিশাল প্রেক্ষাপটে জীবন ও মৃত্যুর তাৎপর্য তুলে ধরে।
তাঁর কবিতায় এমন অনেক চিত্রকল্প তৈরি হয় যা বাস্তবতার ধরাছোঁয়ার বাইরে, যেন কবির অবচেতন মনের projection।
“একদিন জল ভেঙে ধানসিঁড়ি নদীর কিনারে / দেখিব—কাঁঠাল গাছে জাম্বুরা লিচুর ভিড়ে / আমার সোনার ধান ঘুমে অচেতন—” (রূপসী বাংলা) এই পঙ্ক্তিটিতে নদীর কিনারে সোনার ধানের অচেতন ঘুম এক স্বপ্নিল পরিবেশ তৈরি করে।
“পেঁচা শুধু চেয়ে রয়,— ঘুমহীন—ঘুমের ভণিতা করে না কো” (আবহমান) পেঁচার ঘুমহীন চেয়ে থাকা যেন এক রহস্যময় কল্পনার জগৎের সৃষ্টি করে।
কবির ব্যক্তিগত দুঃখবোধ, নিঃসঙ্গতা এবং আকাঙ্ক্ষা তাঁর কল্পনার সাথে মিশে এক নতুন রূপ লাভ করে।
“আমি যদি হতাম বনহংসী—কার্তিকের জ্যোৎস্নার রাতে” (সুরঞ্জনা) অন্য কিছু হওয়ার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা কবির কল্পনার এক বিষণ্ণ প্রকাশ।
তাঁর কবিতায় গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের জীবন, প্রকৃতির রূপ, নদ-নদী, মাঠ-ঘাট অত্যন্ত জীবন্তভাবে ফুটে ওঠে।
সমালোচনামূলক আলোচনা:
জীবনানন্দ দাশের কাব্য ও কবিতা বাংলা সাহিত্যের এক ব্যতিক্রমী সম্পদ। তাঁর কবিতার জগৎ শুধু প্রকৃতির রূপায়ণ বা ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ নয়, বরং এর গভীরে প্রোথিত রয়েছে এক গভীর দার্শনিক জিজ্ঞাসা ও জীবনবোধ। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর কবিতার সমালোচনা করলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে। জীবনানন্দের কবিতায় মানুষের অস্তিত্বের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং নশ্বরতার ভাবনা প্রবলভাবে অনুভূত হয়।
তিনি সময়ের স্রোতে জীবনের বিলীন হয়ে যাওয়া, মানুষের একাকিত্ব ও অসহায়তাকে গভীর বেদনার সাথে উপলব্ধি করেছেন। কেউ কেউ বলতে পারেন কবির এই নশ্বরতার চেতনা কিছুটা নৈরাশ্যবাদী। তবে এর বিপরীতে বলা যায়, এই উপলব্ধি জীবনের গভীরতা ও তাৎপর্য অনুধাবনের জন্য জরুরি।
তিনি ক্ষণস্থায়ী জীবনের মূল্য এবং প্রকৃতির অনন্ত প্রবাহের মধ্যে মানুষের স্থানকে প্রশ্ন করেছেন। জীবনানন্দের কবিতায় সময় একটি বহমান এবং পরিবর্তনশীল সত্তা। ইতিহাস স্মৃতি ও বিস্মৃতির এক অদ্ভুত খেলা, যেখানে বর্তমান অতীতের ছায়া বহন করে। কারো মতে, কবির সময়ের ধারণা কিছুটা অস্পষ্ট ও মূর্ত। তবে এই অস্পষ্টতাই সময়ের রহস্যময়তাকে তুলে ধরে। ইতিহাসকে তিনি শুধু ঘটনার পরম্পরা হিসেবে দেখেননি, বরং মানুষের স্মৃতি ও চেতনার অংশ হিসেবে দেখেছেন। জীবনানন্দের প্রকৃতি শুধু মনোরম দৃশ্য নয়, বরং এক গভীর রহস্যের আধার। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান যেন জীবনের কোনো না কোনো দার্শনিক সত্যের ইঙ্গিত বহন করে।
জীবনানন্দ দাশের দর্শন সমালোচনা:
কেউ বলতে পারেন কবি প্রকৃতিকে অতিরিক্ত ভাবালুতার চোখে দেখেছেন। তবে তাঁর প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ গভীর এবং প্রতীকী। প্রকৃতির মাধ্যমে তিনি জীবনের জটিলতা ও রহস্যময়তাকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। জীবনানন্দের কাব্যে স্মৃতি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অতীত দিনের অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতি বর্তমানকে প্রভাবিত করে। আবার সময়ের সাথে সাথে অনেক স্মৃতি বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। কারো মতে, কবির স্মৃতিচারণ কিছুটা ব্যক্তিগত ও আবেগপ্রবণ। তবে এই ব্যক্তিগত আবেগ সার্বজনীন মানব অভিজ্ঞতার অংশ। স্মৃতি কীভাবে আমাদের বর্তমানকে গড়ে তোলে এবং বিস্মৃতি কীভাবে অতীতকে আবছা করে দেয়, এই দার্শনিক প্রশ্ন তাঁর কবিতায় উঠে আসে। জীবনানন্দের কবিতায় স্বপ্ন এবং বাস্তবতার মধ্যে এক সূক্ষ্ম সম্পর্ক বিদ্যমান। অনেক সময় স্বপ্ন বাস্তবতার কঠিনতাকে অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষা জাগায়, আবার কখনও স্বপ্নভঙ্গ জীবনের রূঢ়তাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
কেউ বলতে পারেন কবি স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন টানতে পারেননি! তবে এই অস্পষ্টতাই জীবনের দ্বান্দ্বিকতাকে তুলে ধরে! স্বপ্ন এবং বাস্তব—এই দুইয়ের টানাপোড়েন মানুষের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত।
জীবনানন্দের কবিতার ভাষা গতানুগতিক কাঠামোর বাইরে এক নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে! তাঁর উপমা, চিত্রকল্প এবং শব্দচয়নের মাধ্যমে তৈরি অনুভূতি ও বোধের জগৎ ছিলো প্রচলিত ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
কিন্তু, কবির ভাষা কিছুটা দুর্বোধ্য ও জটিল। তবে এই জটিলতা অনেক সময় গভীর দার্শনিক চিন্তার বাহন হিসেবে কাজ করে।
তিনি ভাষার গতানুগতিক ব্যবহার ভেঙে দিয়ে নতুন অর্থ ও সম্ভাবনা তৈরি করতে চেয়েছেন! জীবনানন্দ দাশের কবিতায় একটি স্বতন্ত্র দার্শনিক জগৎ বিদ্যমান।
জীবননান্দ দাশের কবিতা মানব অস্তিত্ব, সময়, প্রকৃতি, স্মৃতি এবং স্বপ্ন নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে! তাঁর দার্শনিক ভাবনা কোনো সুসংবদ্ধ তত্ত্বের আকারে না থাকলেও, কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে জীবনের গভীরতর অর্থ অনুসন্ধানের এক ব্যাকুলতা রয়েছে।
তাঁর কবিতায় আমরা নৈরাশ্যবাদিতা, অস্পষ্টতা বা দুর্বোধ্যতা, হতাশা খুঁজে পাই! কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জীবনানন্দের কবিতা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
উপসংহার:
পরিশেষে একটি বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন তা হলো জীবননান্দ দাশ যে স্বাধীন কল্পনানার মধ্যকার চিন্তার ভিত্তিতে, কেউ কেউ কবি, বলে মনে করেছেন, সেই কল্পনা ও স্বাধীন চিন্তনের উৎস কি, কেন সকলে মধ্যে এ ধরনের কল্পনা চিন্তাশক্তি বিরাজ করে না।
শুধু কারো কারো মধ্যে বিরাজমান- এ প্রশ্নের জবাব জীবনানন্দের কোনো লেখাতে আছে বলে মনে হয় না।
তবে সময় ও বাস্তবতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয় বলে তিনি স্বীকার করেছেন! অন্যদিকে কবিতার পাঠকদের মধ্যে সকলেই সমানভাবে কোনো কবিতা বুঝবে এমন নয় বলে তিনি স্বীকার করলেও, যথাসম্ভব কবিতাকে সর্বজনীন করার দ্বায় কবির আছে বলে জীবনানন্দ মনে করেন। সময় ও পৃথিবী অভিজ্ঞতার আধার।
কবিও সঞ্চয়ী! কিন্তু তার আনীত অভিজ্ঞতা কতখানি সার্বিক, কতখানি তার নিজের এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে কতদূর ওপরের করে তুলতে পারা যায়, সকলকে না হোক, অনেকেই পরিদীকক্ষিত করতে পারা যায় নিজের মূল্যাজ্ঞানের চেতনায় এ দায়িত্ব কবির।
জীবনানন্দ দাশের কবিতা ও কাব্য শুধু সাহিত্যিক মূল্যের বিচারে নয়, দর্শন দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ! তাঁর কবিতা মানব অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্ন, সময়ের বহমানতা, প্রকৃতির রহস্য, স্মৃতির প্রভাব এবং স্বপ্ন ও বাস্তবতার দ্বান্দ্বিকতাকে এক অনন্য কাব্যিক ভাষায় তুলে ধরে।
জীবনানন্দ দাশের দর্শন ভাবনা কোনো সুসংবদ্ধ তত্ত্ব নয়, বরং জীবনের গভীর উপলব্ধি যা তাঁর কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে অনুরণিত হয়! জীবনানন্দের কাব্য পাঠকদের এক গভীর আত্মবিশ্লেষণ এবং জীবনের তাৎপর্য অনুসন্ধানে উৎসাহিত করে।