অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন লক

অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন লক সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন

দার্শনিকদের জীবনী ফিলোসোফি কোর্স বাংলায়

আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনে, বুদ্ধিবাদের বিপরীতে যাদের অবস্থান অগ্রগণ্য; দার্শনিক জন লক ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন লক ছিলেন বস্তুবাদের বা জড়বাদের জনক।

অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন লক, তার বইতে সহজাত ধারণা নিয়ে অনেক আলোচনা করেছেন। অন্যান্য দার্শনিকের সহজাত ধারণার পক্ষে যুক্তির সমালোচনা করেছেন! তাহলে চলুন, আমরা অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন লক এর জীবনী ও দর্শন নিয়ে আলোচনা করবো।

জন লকের জন্ম:

জন লক ১৬৩২ সালের ২৯ আগস্ট ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল এলাকার রিংটন গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন! লক ছোট বেলায় তার মাকে হারান। ঐ সময়ের ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অনেক গােলযােগপূর্ণ।

কিন্তু এ সত্ত্বেও বাবার সুষ্ঠ তত্তাবধান ও পরিচালনায় উপযুক্ত শিক্ষার সব সুযোগ সুবিধা পেয়েছিলেন জন লক! ১৬৪৬ সালে তিনি লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার স্কুলে এবং ১৬৫২ খ্রিস্টাব্দে অক্সফোর্ডের ক্রাইস্টচার্চ কলেজে জুনিয়র স্টুডেন্ট হিসেবে ভর্তি হন।

জন লকের শিক্ষা:

দর্শন, বিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্র ছিল জন লকের শিক্ষার প্রধান বিষয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়য়ের পাঠ্যসূচি তার আদৌ মনের মতো ছিল না। ফলে; প্রচলিত এরিস্টটলীয় দর্শনের প্রতি তার কোনাে আকর্ষণ ছিল না। এর পরিবর্তে জন লক চেয়েছিলেন ডেকার্টের দর্শন পড়তে।

যাই হােক, জন লকের পড়াশােনার অগ্রগতিতে কর্তৃপক্ষ যে খুশি ছিলেন তাতে কোনাে সন্দেহ নেই। কারণ; ১৬৫৯ সালে তাকে জুনিয়র থেকে সিনিয়র স্টূডেন্টশিপে উন্নীত করা হয়। শুধু তা-ই নয়; এর তিন চার বছর পর তিনি সম্মানিত টিউটর পদে নিযুক্ত হন।

দার্শনিক জন লকের পঠিত বিষয়:

জ্ঞানানুশীলনের ক্ষেত্রে লকের আগ্রহ ও আকর্ষণ ছিল বহুমুখী। প্রথমেই তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন ধর্মতত্ত্বের প্রতি। কিন্তু; অচিরেই তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রের দিকে মনােনিবেশ করেন, এবং কিছুদিন অক্সফোর্ডের এক বিশিষ্ট চিকিৎসাবিদের সহকারী হিসেবে কাজ করেন।

পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সমস্যাবলী প্রভৃতি বিষয়েও তিনি প্রচুর পড়াশােনা করেন! ১৬৬৬ সাল থেকে তিন সহিষ্ণুতা সম্বন্ধে রচনা (Essay concerning Toleration) শীর্ষক একটি গ্রন্থ রচনার কাজ শুরু করেন।

বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সারাজীবন তিনি যে উদারতা ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছিলেন; এ গ্রন্থটি ছিল তারই এক সুষ্পষ্ট নিদর্শন। এতে তিনি সর্বপ্রকার নির্যাতন-নিষ্পেষণের নিন্দা করেন; নাগরিক ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রয়ােজনীয়তা ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন; এবং সব পক্ষের কাছে গ্রহণযােগ্য শর্তে ইংল্যান্ডের চার্চ ও অন্য সব সংস্থার মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তােলার আহ্বান জানান।

দার্শনিক জন লক এর জীবনে সাফ্‌টস্‌বেরীর প্রভাব:

অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন লক চিকিৎসাবিজ্ঞানেও স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেছিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনুশীলন ও চর্চা করতে গিয়ে; ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে হঠাৎ লর্ড এসূলির (পরবর্তীকালে আর্ল অব সাফটসবেরী) সাথে জন লকের পরিচয় ঘটে! এ পরিচয় ক্রমশ বন্ধুতে পরিণত হয় এবং এর ফলে লকের জীবনে লক্ষণীয় পরিবর্তন সূচিত হয়।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রেখেই তিনি সাফটসূবেরীর ছেলের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হন। এছাড়াও; বিভিন্ন পারিবারিক ও রাজনৈতিক ব্যাপারে তিনি ঐ পরিবারকে অনেক সাহায্য করেন।

সে সময় পরীক্ষণ বিজ্ঞানে জন লকের বিশেষ আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়; এবং এর স্বীকৃতি স্বরূপ ১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে রয়্যাল সােসাইটির ফেলাে নির্বাচিত করা হয়! লর্ড সাফটসবেরীর সাহচর্যে থেকে লক সেদিনের বিশিষ্ট জ্ঞানীব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযােগ পান! হবসের সঙ্গে ক্যাভেন্ডিস পরিবারের যে ধরনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল; সাফটসবেরীর সঙ্গে লকের সম্পর্ক ছিল অনুরূপ।

তবে লকের বিশেষ সুবিধা ছিল এখানে যে, সাফটসবেরী একজন বিশিষ্ট রাজনীতিক হওয়ার ফলে; তার সাহায্যে লক একজন রাষ্ট্রীয় মন্ত্রীর উপদেষ্টা হতে পেরেছিলেন! ওই পদে অধিষ্ঠিত থেকেই তিনি ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে ক্যারােলিনা উপনিবেশের সংবিধান প্রণয়নে সাহায্য করেছিলেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, জন লক সহিষ্ণুতাবিষয়ক তার ধারণাবলিকে উক্ত সংবিধানে স্থান দিয়েছিলেন! নীতির ক্ষেত্রে সাফটসবেরী ছিলেন আধুনিক ধারণাবলির সমর্থক। আর এজন্যই ক্ষমতা ব্যবহারে তিনি রাজার সমর্থনের পরিবর্তে দলীয় যন্ত্রের সাহায্য নিতেন।

দার্শনিক জন লকের নির্বাসন গ্রহণ:

রাজা জেমস্ যখন ক্যাথলিক ধর্মমতের সমর্থন করেন তখন সাফটসবেরী তাকে পরবর্তী রাজা হিসেবে মনােনীত না করার সুপারিশ করেন। ফলে; নানারকম ষড়যন্ত্র ও পাল্টা ষড়যন্ত্র হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত; সাফটসবেরীকে বরখাস্ত করা হয়, এবং তিনি তখন হল্যান্ডে পালিয়ে যান।

রাজার বিরুদ্ধে সাফটসবেরী যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন এদের কোনাে কোনােটির ব্যাপারে জন লক সহানুভূতিশীল না হলেও; রাজার নিরঙ্কুশ ক্ষমতার স্থলে পার্লামেন্টের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের পক্ষে সাফটসবেরীর অভিমতের সঙ্গে তিনি সম্পূর্ণ একমত ছিলেন।

অতি স্বাভাবিক কারণেই রাজা সাফটসবেরীর অন্তরঙ্গ বন্ধু লককে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেন! ফলে, খারাপ পরিণতির আশঙ্কা করে লক ১৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে (যে বছর সাফটসবেরী মারা যান) হল্যান্ডে গিয়ে স্বেচ্ছায় নির্বাসিত জীবন যাপন শুরু করেন।

হল্যান্ডে প্রিন্স উইলিয়াম অব অরেঞ্জ-এর সঙ্গে জন লকের পরিচয় ঘটে। এরপর; ১৬৮৮ সালে এক রক্তহীন বিপ্লবের মাধ্যমে জেমসূকে উৎখাত করা হলে; উইলিয়াম অব অরেঞ্জ ও তার স্ত্রী ম্যারীকে বৃটিশ সিংহাসনে আরােহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানাে হয়।

ফলে জন লক রাজকীয় দলের সঙ্গে দেশে ফিরে আসেন। তখন তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, দরিদ্র আইনের সংশােধন, শিক্ষাপদ্ধতির সংস্কার, রাজ্যের অর্থনীতির পুনর্গঠন প্ৰভতি বিষয়ে তার সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করার সুযােগ পান। তাকে তখন ব্যান্ডেনবাগে রাষ্ট্রদূতের পদ গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানাে হয়; কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন ।

দার্শনিক জন লক এর বিখ্যাত কর্ম:

তাঁর সহিষ্ণুতা বিষয়ক পত্রাবলি (Letters Concerning Tolerance) প্রকাশিত হয় ১৬৮৯ খ্রিস্টাব্দে। এর এক বছর পর; প্রকাশিত হয় সরকার সম্বন্ধে দুটি নিবন্ধ (TO Treatises on Government) এবং মানববুদ্ধি সম্বন্ধে একটি নিবন্ধ (An Essay Concerning Human Understanding)! এ গ্রন্থদ্বয় প্রকাশের পর ইউরােপীয় দার্শনিক মহলে তার নাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে দ্বিতীয় গ্রন্থটি বিপুল সাফল্য অর্জন করে! আর তখন থেকেই এর পক্ষে ও বিপক্ষে লেখালেখি চলতে থাকে।

একদিকে তরুণ সমাজ যেমন একে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানায়; অন্যদিকে আবার প্রাচীনপন্থীরা একে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করে। এভাবে গ্রন্থটিকে কেন্দ্র করে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

গ্রন্থটি সংশয়বাদী মতের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত – এ অভিযােগে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক গ্রন্থটি নিন্দিত হয়। এ সত্ত্বেও; ১৬৯৪ সালে গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ; ১৬৯৫ সালে তৃতীয় করণ এবং ১৭০০ সালে চতুর্থ সংস্করণ প্রকাশিত হয়! এ বিরাট গ্রন্থটি প্রকাশের পরবর্তী কয়েক বছর লক অন্যান্য বিষয়েও চিন্তা ভাবনা করেন।

সেদিনের নতুন সরকার যেসব অর্থনৈতিক অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিলেন; সেগুলাের কথা ভেবে তিনি অর্থনীতি বিষয়ে ১৬৯১ সালে একটি এবং এর চার বছর পর আরেকটি গ্রন্থ রচনা করেন! ১৬৯৩ সালে তিনি প্রকাশ করেন শিক্ষা সম্বন্ধে কিছু চিন্তা (Some Thoughts Concerning Education) শীর্ষক একটি গ্রন্থ; এবং ১৬৯৫ সালে প্রকাশিত হয়, খ্রিস্টধর্মের যুক্তিযুক্ততা (The Reasonableness of Christianity) নাম আরেকটি গ্রন্থ।

রেনে দেকার্তের জীবনী পড়ুন..

অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন লক এর রচনা:

বইয়ের নাম:প্রকাশ
Letters Concerning Tolerance১৬৮৯
TO Treatises on Government১৬৯০
An Essay Concerning Human Understanding১৬৯০
Some Thoughts Concerning Education১৬৯৩
The Reasonableness of Christianity১৬৯৫
দার্শনিক জন লক এর রচনা সমূহ

দার্শনিক জন লকের শেষ জীবন:

লন্ডনে দু’বছর বসবাসের পর তিনি এসেক্স-এ স্বায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন! সেখানে মাসাম নামক এক ব্যক্তির সাথে দার্শনিক জন লকের বন্ধুত্ব হয়। অপরদিকে; মিসেস মাসাম ছিলেন বিশিষ্ট কেম্ব্রিজ প্লেটোবাদী দার্শনিক কুডওয়ার্থের কন্যা।

বাগান করা, নিয়মিত ঘােড়ায় চড়া এবং দর্শন কর্মে নিয়ােজিত থাকা ছাড়াও জন লক জ্ঞানী ব্যক্তিদের সঙ্গে যােগাযােগ অব্যাহত রাখেন।

জন লক পল্লী এলাকায় বাস করতেন বলে তিনি যে রাজনৈতিক জীবন থেকে বিছিন্ন ছিলেন তা নয়! বরং, ১৬৯৬ সালে তিনি ট্রেড এন্ড প্ল্যান্টেশন-এর কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিলেন। স্বাস্থ্যগত কারণে; চার বছর পর তিনি এ চাকরি ছেড়ে দেন। ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে ৭৩ বছর বয়সে তিনি মারা যান।

উৎস- google search

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *