১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের ১২টি কারণ ও ফলাফল জেনে নিন

১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের ১২টি কারণ ও ফলাফল জেনে নিন

বাংলার ইতিহাস বিসিএস বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক

প্রিয় পাঠক, আজকে আমরা ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের কারণ ও ফলাফল বিস্তারিত আলোচনা করবো! ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে বাংলার বর্ণ হিন্দু ও কায়েমী স্বার্থবাদী মহল বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধিতা শুরু করেন। তারা; বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তকে “বাঙ্গালি বিরোধী, জাতীয়তাবাদী বিরোধী এবং বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ” হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী বঙ্গভঙ্গকে জাতীয় দূর্যোগ এবং বাঙালি জাতীয়তাববাদের সংকটময় মুহূর্ত বলে বর্ণনা করেন! ১৯০৬ সালে মুসলিম লিগ গঠন এবং ১৯০৯ সালের মর্লি মিন্টো সংস্কার আইনে মুসলমানদের জন্য সতন্ত্র নির্বাচন ব্যবস্থা হিন্দুদেরকে আরো উদ্বিগ্ন করে তোলে।

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী প্রতিবাদ আন্দোলন ক্রমে স্বদেশী আন্দোলনে পরিণত হয়। সর্বত্র বিলাতি দ্রব্য বয়কট; এবং প্রকাশ্যে আগুনও লাগানো হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বর্জন করে। এর পাশাপাশি; চরম পন্থি কাজ কর্ম ও সন্ত্রাস বাদী কাজও শুরু হয়! ঢাকা কলকাতায় গুপ্ত সমীতি গড়ে ওঠে! বিপ্লবীরা বাংলার গভর্নর ফ্রেজার এবং পূর্ব বঙ্গ ও আসামের গভর্নর ফুলারকে হত্যার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালায়। 

১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের কারণ সমূহ (Causes of the Annulment of Partition of Bengal of 1911):

(১) উগ্রজাতীয়তাবাদী আন্দলোনঃ
ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ববৃন্দ বঙ্গভঙ্গ কে হিন্দু বাঙালি জাতীয়তাবাদের ক্রমবর্ধমান শক্তি বিনাশের একটা ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেন। তারা মনে করেন যে; এই অবস্থা কার্যকর হলে এ প্রদেশের বিভিন্ন অনগ্রসর সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের ও নবজাগরণ দেখা দেবে; এবং রাজনৈতিক চেতনা বোধ জাগ্রত হবে! এ ভয়ে তারা বঙ্গ বিভাগকে অযৌক্তিক ও অন্যায় বলে দাবি করেন এবং এর বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য সংগ্রামের ডাক দেন।

(২) কংগেসের প্রচারণাঃ
কংগ্রেস নেতারা বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তকে বাংলা ভাষাভাষী জনগণের বিকাশমান সংহতি ও চেতনার প্রতি সুনিশ্চিত আঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন! তারা মনে করেন; বঙ্গভঙ্গ ভারতের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনরত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে ধ্বংস করার জন্য পরিচালিত হচ্ছে। তাই; তারা বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য আন্দোলনে নামেন।

(৩) বুদ্ধিজীবী মহলের প্রচারণাঃ
কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহল থেকে প্রচার করা হয় যে বঙ্গভঙ্গের অর্থ হচ্ছে মাতৃভূমিকে বিভক্ত করা! এর সাথে মাতৃভূমিকে কলঙ্কিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। ফলে; তারা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অভিযান শুরু করেন এবং অনতিবিলম্বে তা দুর্বার আন্দোলনে রূপ নেয়।

(৪) পত্র-পত্রিকা প্রচারণাঃ
পূর্ববঙ্গের নতুন নতুন পত্রিকা প্রকাশিত হলে পশ্চিমবঙ্গের সংবাদপত্রের চাহিদার অনেকাংশে কমে যায়! এ কারণে পত্রিকার মালিকেরা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে চরম উত্তেজনাকর ও সম্পাদকীয়তে লেখা পরিবেশের মাধ্যমে; সারাদেশে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে পরিবেশ উত্তপ্ত করে তোলে।

(৫) স্বদেশী আন্দোলনঃ
বঙ্গভঙ্গের ফলে স্বদেশী আন্দোলনের জন্ম হয়। এই আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিলাতি দ্রব্য বর্জনের মাধ্যমে; ব্রিটিশ সরকারের ওপর বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য চাপ সৃষ্টি করা। হিন্দুরা বিলাতি দ্রব্য বর্জন শুরু করার ফলে; কল-কারখানার অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়; এবং ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হন।

(৬) গুপ্ত হত্যাকাণ্ড ও ভীতির পরিবেশ সৃষ্টিঃ
বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা সারাদেশে হত্যাকাণ্ড ও হত্যার প্রচেষ্টা চালিয়ে সারাদেশে এক ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে! গভর্নর জেনারেল লর্ড মিন্টো বাংলার ছোটলাট কে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এভাবে; সারা ভারতবর্ষে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে এক নাজুক পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

(৭) স্বার্থান্বেষী মহলের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী প্রচেষ্টাঃ

কলকাতার আইনজীবী সমিতি পত্রিকার সম্পাদকরা বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় তাদের ভবিষ্যত বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায়; বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়।

(৮) সরকারি কর্মচারীদের ওপর প্রভাবঃ
বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ ছাড়াও অন্য দেশের হিন্দু নেতারা তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে সরকারি কর্মচারীদের কে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।

(৯) বড়লাটের নিকট স্মারকপত্র প্রদানঃ
১৯১১ সালের জুন মাসে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি নেতৃত্বে বাংলার ১৮ টি জেলার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য আবেদন জানিয়ে; ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ডহার্ডিঞ্জ এর নিকট একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন।

(১০) মুসলিম লীগের দুর্বলতাঃ
কংগ্রেস ছিল একটি শক্তিশালী সংগঠন আর মুসলিম লিখছিল দুর্বল সংগঠন। তাই মুসলিম লীগের পক্ষের আন্দোলন ঠেকানো সম্ভব হয়নি। এজন্য; বঙ্গভঙ্গ রদ করা সহজ হয়।

(১১) রাজনীতিবিদদের পূর্ব অভিজ্ঞতার সত্যতাঃ
হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছুসংখ্যক সুচতুর অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ বুঝেছিলেন যে বঙ্গভঙ্গ স্থায়ী ঘটনা হলে পূর্ববঙ্গের মুসলমান সম্প্রদায়; রাজনৈতিক দিক দিয়ে সুসংগঠিত হবার সুযোগ পাবে; এবং ভবিষ্যতে এ উপমহাদেশে কংগ্রেসের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। ফলে; উপমহাদেশে রাজনৈতিক স্বার্থ ভাগাভাগির প্রশ্ন এসে দাঁড়াবে।

এ অবস্থাটি তখন হবে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিকট আরো বেশি মারাত্মক! ফলে, ভঙ্গভঙ্গ ব্যবস্থা কোনো ক্রমেই তাদের নিকট গ্রহনযোগ্য বলে তারা আপষহীন সংগ্রামের ডাক দেন। ফলে; সব মিলিয়ে বঙ্গভঙ্গ রদের গতিধারা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে।

(১২) ব্রিটিশ সরকারের মনোবলঃ ব্রিটিশ বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য, আন্দেলন যখন ভয়াবহ রুপ লাভ করে; সে মুহুর্তে বঙ্গভঙ্গকে টিকিয়ে রাখার জন্য সে মনোবল দরকার তা অচিরেই হারিয়ে ফেলে। তাই; ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করেন।

উপরোক্ত ঘটনার প্রবাহের প্রেক্ষিতে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর তারিখে দিল্লির রাজদরবারে সম্রাট পঞ্চম জর্জের অভিষেক অনুষ্ঠানে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষিত হয়! এ সকল ঘটনা বা কারণগুলো বঙ্গভঙ্গ রদ বা অন্দোলনে ইন্ধন যুগিয়েছিলো সত্য, কিন্তুু; প্রকৃত পক্ষে, বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলন জোরদার করার পিছনে হিন্দু সম্প্রদায়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ সম্পর্কিত প্রধান কারণ জড়িত ছিলো।

১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের ফলাফল ও প্রতিক্রিয়াঃ

বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণায় মুসলমানদের ওপর নেমে আসে এক বিষাদের ছায়া। বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণায় মুসলিম নেতৃ বৃন্দ সাংঘাতিক ভাবে ক্ষুব্ধ হন; এবং ইংরেজ সরকারকে বিশ্বাস ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করেন! স্যার সলিমুল্লাহর অসুন্তষ্টকে কেন্দ্র করে তাকে খুশি করার জন্য ইংরেজ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

এছাড়াও-

(১) মুসলমানগণ সাংগঠনিক চেতনায় সমৃদ্ধিশালী হয়ে ওঠেন এবং দাবী আদায়ের নিমিত্তে ঐক্য বদ্ধ সাংগঠনিক প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা অপরিসিম; এই সত্য অনুধাবন করেন।

(২) রাজনীতিতে বিশ্বাসের স্থান নেই। এই সত্য সম্পর্কে মুসলমানগণ সচেতন হয়ে ওঠেন।

(৩) ভবিষ্যতের দাবী আদায়ের সংগ্রামে নামতে হলে নিজেদেরকে শক্তি অর্জন করতে হবে; এবং কারো শক্তি উপর আস্থা রাখা উচিত হবে না। এ বোধ মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে জাগ্রত হয়! স্বাধীকার অর্জনের পথ সহজ সাধ্য নয়, বরং দূর্গম। এ সত্যও উপলব্ধি করেন।
(৪) এ উপমহাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ই তাদের এক মাত্র প্রতিদ্বন্দী এ ধারণা বদ্ধমূল হয়।

পাল যুগের পূর্ণ ইতিহাস জেনে নিন

বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা মুসলমান সম্প্রদায়কে নিরাশ করেছিলো সত্য, কিন্তু; মুসলমান সম্প্রদায় এর থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন ভবিষ্যত চলার অফুরন্ত আলো! এর মাধ্যমে তারা শিক্ষা রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আরো সচেতন হন। নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

সুতরাং; আমরা বলতে পারি বঙ্গভঙ্গ রদের শুধু নেতিবাচক দিকিই নয়, ইতিবাচক দিকও আমােদের সামনে প্রতিয়মান হয়।

উৎস-ইন্টারনেট

শেয়ার করুনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *